অর্থনৈতিক সংকটের কারণে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ অনেক শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিকে পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হিমশিম খায়। এসব শিক্ষার্থীর জন্য সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন শিক্ষাবৃত্তি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হয়ে উঠেছে। এসব বৃত্তির মাধ্যমে টিউশন ফি, বই-খাতা, পোশাকসহ শিক্ষা-সংক্রান্ত বিভিন্ন খরচ মেটানোর সুযোগ রয়েছে।
চলতি ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়েছে। এবার মোট ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছে। তাদের অনেকেই এখন একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির প্রস্তুতি নিচ্ছে। এরই মধ্যে কিছু বৃত্তির আবেদন শুরু হয়েছে, আবার কিছু বৃত্তির আবেদন ফল প্রকাশের কয়েক মাস পর শুরু হবে।
এসএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের জন্য উল্লেখযোগ্য ৯টি সরকারি-বেসরকারি শিক্ষাবৃত্তি ও উপবৃত্তির তথ্য তুলে ধরা হলো—
১. বোর্ড বৃত্তি
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর ও কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রতিবছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মেধাবৃত্তি ও সাধারণ বৃত্তি দেওয়া হয়।
সাধারণত ফল প্রকাশের কয়েক মাস পর বৃত্তির কার্যক্রম শুরু হয়। এ জন্য আগ্রহী শিক্ষার্থীদের সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর ও শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইটে নিয়মিত নজর রাখতে হবে।
২. ডাচ্-বাংলা ব্যাংক শিক্ষাবৃত্তি
মেধাবী ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য ডাচ্-বাংলা ব্যাংক শিক্ষাবৃত্তি দিয়ে থাকে। ২০২৬ সালের বৃত্তির জন্য অনলাইনে আবেদন নেওয়া হচ্ছে। আবেদন করা যাবে আগামী ৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। প্রাথমিকভাবে বাছাই করা প্রার্থীদের তালিকা ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।
সিটি করপোরেশন ও জেলা শহর এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের চতুর্থ বিষয় বাদে জিপিএ-৫ থাকতে হবে। তবে গ্রামীণ ও অনগ্রসর এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে উত্তীর্ণদের ক্ষেত্রে ন্যূনতম জিপিএ ৪.৮৩ নির্ধারণ করা হয়েছে।
এইচএসসি পর্যায়ে দুই বছর বৃত্তি দেওয়া হবে। প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা, বছরে পাঠ্য উপকরণের জন্য ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং পোশাকের জন্য ১ হাজার টাকা দেওয়া হবে।
গ্রামীণ ও অনগ্রসর এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য মোট বৃত্তির ৯০ শতাংশ এবং ছাত্রীদের জন্য ৫০ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সরকারি বৃত্তি ছাড়া অন্য কোনো উৎস থেকে বৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীরা এ বৃত্তির জন্য যোগ্য হবেন না।
৩. শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন
এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ মেধাবী ও অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য শাহ্জালাল ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন শিক্ষাবৃত্তি দিয়ে থাকে। বর্তমানে ২০২৫ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং এইচএসসি বা সমমান পর্যায়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের জন্য আবেদন নেওয়া হচ্ছে।
বিভাগীয় শহর বা সিটি করপোরেশন এলাকার বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম জিপিএ ৫.০০ এবং অন্যান্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের ৪.৮০ থাকতে হবে।
সিটি করপোরেশনের বাইরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম জিপিএ ৪.৮০ এবং অন্যান্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের ৪.৫০ থাকতে হবে।
এ ছাড়া আবেদনকারীর বাবা, মা বা অভিভাবকের বার্ষিক আয় ২ লাখ টাকার বেশি হলে আবেদন গ্রহণ করা হবে না।
আগ্রহীদের অনলাইনে প্রয়োজনীয় তথ্য ও কাগজপত্র দিয়ে ২৭ আগস্ট ২০২৬-এর মধ্যে আবেদন করতে হবে। সরাসরি বা অন্য কোনো মাধ্যমে আবেদনের সুযোগ নেই।
৪. প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্টের আওতায় একাদশ ও আলিম প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়া আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি দেওয়া হয়।
২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের আবেদনের সময়সীমা ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এ বৃত্তির ক্ষেত্রে আবেদনকারীর অভিভাবকের বার্ষিক আয় ৩ লাখ টাকা বা তার কম হতে হয়।
৫. সোনালী ব্যাংক শিক্ষাবৃত্তি
সোনালী ব্যাংক পিএলসি সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) কর্মসূচির আওতায় দরিদ্র, মেধাবী ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তি দিয়ে থাকে।
সাধারণত এইচএসসি বা সমমান পর্যায়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা এ বৃত্তির আওতায় আসে। নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হলে নির্ধারিত যোগ্যতা ও সময়সীমা অনুযায়ী আবেদন করতে হবে।
৬. সমন্বিত উপবৃত্তি কর্মসূচি
সরকারের সমন্বিত উপবৃত্তি কর্মসূচির আওতায় একাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি দেওয়া হয়।
তবে কোনো শিক্ষার্থী অন্য সরকারি উৎস থেকে উপবৃত্তি বা অভিভাবকের কাছ থেকে শিক্ষা ভাতা পেলে এ উপবৃত্তির জন্য যোগ্য হবে না। একইভাবে শিক্ষা বোর্ড থেকে মেধা বা সাধারণ বৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীরাও এ উপবৃত্তির আওতায় আসবে না।
৭. ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের বৃত্তি
প্রবাসী কর্মীদের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সন্তানদের জন্য শিক্ষাবৃত্তির সুযোগ রয়েছে। ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের মাধ্যমে এ বৃত্তি দেওয়া হয়।
প্রবাসী কর্মীর সন্তানদের জন্য এটি উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সহায়তা হিসেবে কাজ করে।
৮. মেঘনা গ্রুপের ‘নাম্বার ওয়ান বাবার কৃতী সন্তান’
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের জনপ্রিয় ব্র্যান্ড ‘নাম্বার ওয়ান’-এর উদ্যোগে প্রান্তিক পর্যায়ের চা-দোকানি বাবা-মায়ের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া সন্তানদের জন্য ‘নাম্বার ওয়ান বাবার কৃতী সন্তান সংবর্ধনা ২০২৬’ আয়োজন করা হচ্ছে।
নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা এককালীন শিক্ষাবৃত্তির পাশাপাশি এইচএসসির সব বিষয়ের অনলাইন কোর্স, সনদ, ক্রেস্ট, সংবর্ধনা মেডেল ও বিশেষ উপহার পাবেন।
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া যোগ্য শিক্ষার্থীরা ২৫ আগস্ট পর্যন্ত বিনামূল্যে আবেদন করতে পারবেন। যাচাই-বাছাই শেষে নির্বাচিত শিক্ষার্থী ও তাঁদের বাবা-মাকে ঢাকায় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সংবর্ধনা দেওয়া হবে।
৯. মানুষ মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক দাতব্য সংগঠন ‘মানুষ মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ গত বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ মেধাবী ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষাবৃত্তির আবেদন নিয়েছিল।
উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তিতে সহায়তা এবং মাসিক বৃত্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। চলতি বছর নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলে আগ্রহী শিক্ষার্থীরা নির্ধারিত নিয়মে আবেদন করতে পারবেন।
আবেদনের আগে যা খেয়াল রাখবেন
বিভিন্ন শিক্ষাবৃত্তির যোগ্যতা, আবেদনের সময়সীমা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র এক নয়। তাই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা সরকারি দপ্তরের সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তি ভালোভাবে পড়ে নেওয়া জরুরি।
বিশেষ করে অনলাইন আবেদনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে আবেদন সম্পন্ন করতে হবে। ভুল তথ্য, অসম্পূর্ণ ফরম বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকলে আবেদন বাতিল হতে পারে। তাই শিক্ষার্থীদের নিয়মিত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ও বিজ্ঞপ্তি অনুসরণ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।